ভালবাসার প্রকৃত রূপ

আগের রাতেই প্রস্তুতির মানসিক একটা মহড়া রোমেল নামের ছেলেটি নিয়ে নিয়েছিল বলেই সকালে যখন বারংবার কান্না জড়ানো কণ্ঠে মিথিলা নামের মেয়েটি বহুদিনের ভালবাসার উপসংহার দাবী করছিল, ছেলেটির না বোধক উত্তরে কোন ভিন্নতার আগমন ঘটছিল না।
রোমেলের পরিকল্পনার অদ্ভুত দিকটা তো মিথিলার জানার কথা নয়। জানলে একটানা তিনঘন্টা সে কাঁদতে চাইলেও নিশ্চিত রোমেলকে শোনাতে চাইতোনা।
তিন ঘন্টা পর যখন বুঝেছিল রোমেলের পূর্বেকার কোমল হৃদয়ের চারপাশে কোন গোপন কারনে ভয়াবহ একটি পাথুরে দেয়াল তৈরী হয়েছিল তখন বাধ্য হয়ে মেয়েটা পণ করেছিল- ‘রোমেল যখন মানলোইনা , যাক বাবা মার কথাই মেনে নেব, পাত্র কে চোখে না দেখেই রাজী হয়ে যাব।’
অবশ্য এ পণটুকু সে মনে মনেই করেছিল। ফোন রেখে দেয়ার আগে অবশ্য শেষ একবার বলেছিল, ‘রোমেল, তুমি কি আমাকে ভালবাসনা? বল শুধু এই উত্তরটুকু দাও, বিয়ে করতে হবেনা, এতক্ষণ পালিয়ে যাবার যে বায়না ধরেছিলাম, যাও তাও ভুলে যাও , শুধু বল ভালবাস কিনা?’
রোমেল চুপ করে ছিল।
মিথিলা আবার ও বলল, ‘বল না প্লিজ , বল রোমেল , আমি বিয়ের জন্য জোর করব না, কেবল সত্যি কথাটা বল, কেনো বিয়ে করতে চাইছনা জানতে চাইব না, শুধু উত্তরটুকু বলে রেখে দাও।’
তারপর একটু গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কেবল বলেছিল রোমেল, ‘বাসি, উইশ ইউ গুডলাক।’
মিথিলা আর কল দেবে না বললেও, পারেনি। দিয়েছিল, একবার দুবার না অনেকবারই। রোমেল ধরেনি একবারও। ধরবেই বা কেনো, ও তখন ভালবাসার সেই চরম রূপ দর্শনে প্রত্যয়ী ভীষণ। এমনকি মিথিলা দেখা করারও চেষ্টা করেছিল সেদিন, রোমেল যেন হাওয়ায় মিশে গিয়েছিল। কোথাও পায়নি মিথিলা তাকে।
মেয়ে মানুষতো, কত আর কাঁদবে , এক সময় জিদ চেপে বসল। মা-বাবার মুখের হাসিটুকু অবশ্য একটু শান্তি ঝরালো প্রাণে এবং বিয়েটা পাকাপাকি হয়ে গেলো আমেরিকা প্রবাসী জনৈক আজ্জত সাহেবের সাথে।

হায়! রোমেল, মোহাচ্ছন্ন রোমেল! সে যদি জানত ঐ যে ফোনের শেষকথাটুকু আর ফোনে মিথিলার শেষ কাঁন্নার শব্দটুকু –তার চেয়ে বেশী আর কি উৎকর্ষ থাকতে পারে ভালবাসার, প্রকৃত ভালবাসর ওর চেয়ে আর বেশী কি হতে পারে।
অথচ যার প্রভাবে রোমেলের মত এক আত্মপ্রত্যয়ী এবং সেলফসাফিসিয়েন্ট যুবক এমন অম্ভূত সিদ্ধান্ত নিল সে কি বলতে পেরেছিল উপলব্ধির পরবর্তী অর্হনিশি কষ্টকাল কিভাবে কাটায় একজন ব্যর্থ প্রেমিক। বলেনি।

মাস তিনেক আগে থেকে রোমেলকে গুল্লুদার প্রভাব ভীষন ভাবে প্রভাবিত করেছিল । আর করবেই বা না কেনো। পাড়ায় গুল্লু দা তখন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। যার তার উপর প্রভাব খাটাচ্ছেন। বনে গেলেন পাড়ার সকল কাজের কাজী। কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। রোমেলদের পাড়া থেকে অংশগ্রহণ করবে। সংগঠক কে? সেই গুল্লু মহাশয়। তখন সকলকে প্রভাবিত করলেও রোমেলকে অতটা পারেনি। কিন্তু রোমলেকে একদিন ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আগে ডেকে বললেন, ব্যাটের গ্রিপ ছোট করতে , ব্যাস তার কথা শুনেই সেদিন রোমেলের ব্যাটে আসল শতক। ফুটবল খেলায় জার্সি ১০ বদলে পড়তে বললেন ১৩। ব্যাস সেদিন তার একার পায়েই ৩ গোল।এত মেধাবী রোমেলের উপরও প্রভাব তো মারাত্মক ভাবেই পড়লো।
কিন্তু সেটা গুরু শিষ্যের পর্যায়ে গেলো যেদিন রোমেলের বাবা হঠাৎ রাত দুটোয় স্ট্রক করলেন, সবাই খুব বিভ্রান্ত তখন সেই গুল্লুদা যেন ভোজভাজির মত সব ম্যানেজন করে দিল । খুব দৌড়দৌড়ি করল হাসপাতালে সে একাই, রোমেলের বাবা সুস্থ হবার পরেই গুল্লুদার শান্তি হলো।
সেদিন থেকে গুল্লুদার ডান হাত যেন রোমেল। গুল্লুদাও তাই চাইছিলেন বোধহয়, সে জন্যই এত কিছু হয়তো। কারন এ এলাকায় রোমেলরাই সবচেয়ে প্রভাবশালী। হয়তো অনেক গুণ আসলেই ছিল এই গুল্লুদার। তাই বলে ভালবাসার বিষয়তো আর সব বিষয়ের মত সরল নয় । এই বিষয়টি অন্তত রোমেলকে তার সাথে ডিসকাস করা উচিৎ হয়নি।
একদিন আড্ডায় গুল্লু মহাশয় তার প্রিয় দু’শিষ্য-রোমেল আর শিহাবকে শিখাচ্ছিল -‘ভালবাসা চরম মাত্রা বোঝা যায় কখন…’।
সে বলছিল, ‘দিনের পর দিন প্রেম করে এমনকি বিয়ে করে সারা জীবন পার করলেও ভালবাসা বোঝা যায়না। ভালবাসার প্রকৃত রূপ বুঝতে হলে একটাই উপায়। কিন্তু অনেক কঠিন।’
রোমেল আর শিহাব, দু বন্ধুই একসাথে বলে উঠেছিল, ‘গুল্লু দা , কি ,কি?’
গুল্লু মহাশয় বলেছিলেন, ‘যে রাতে প্রকৃত প্রেমিকার বাসর রাত হয় অন্য কোন পুরুষের সাথে, সে রাতেই কেবল বোঝা সম্ভব ভালবাসর পৃকত রূপ। অন্যথায় নয়।’
শিহাব সাথে সাথে প্রটেষ্ট করেছিল। গুল্লু দা হেসেছিল। বলেছিল, ‘সে কারনেই তো কঠিন বললাম রে। ভেবে দেখ ভালবাসার প্রকৃত রূপ না বুঝে ভালবাসে বলেই বেশীর ভাগ প্রেমের বিয়ে ভেঙে যায় আর না হলে অশান্তি লেগেই থাকে। এজন্য আগে সকলের ভালবাসার প্রকৃত রূপ বোঝা দরকার।’
শিহাব তাও মানেনা। তর্ক জুড়ে দেয় গুল্লুদার ওমন আজগুবি কথাবার্তায়। আর রোমেল চুপ করে থাকে।
শিহাব আবার বলে ওঠে, ‘যে ভালবাসা বুঝতে গিয়ে ভালবাসাই হারিয়ে ফেলব সে ভালবাসা বুঝেই লাভ কি আর?’
উঠে চলে গিয়েছিল শিহাব। আর রোমেল বলেছিল, ‘গুরু কথাটার মধ্যে মনে হচ্ছে যুক্তি আছে।’
গুল্লু সেদিন আর তাকে খোঁচায়নি। বুঝেলি চালাক গুল্লু ..আঠা লেগেছে।
তারপর মিথিলার সাথে প্রেমের পরিমাণ যেন আরও বেড়ে গেলো রোমেলের। আগে দিনে দুবেলা কথা হতো এখন তিনবেলা। আগে তিনদিনে একবার দেখলেই মনে শান্তি লাগতো। এখন একদিন পর একবার তো দেখতেই হবে। এই ভালবাসা বৃদ্ধির সাথে মনে মনে গুরুর সেই প্রকৃত ভালাবাস লাভের উপায়টিও ঘুরঘুর করছিল নিয়মিত ।
এর মধ্যে শিহাবটা হঠাৎ পালিয়ে বিয়ে করে ফেলে তার বাল্যকালের প্রেমিকা সস্তিকাকে। এবং সেটাই রোমেলের জন্য হলো আগুনে ঘি দেয়ার মত। সস্তিকার পরিবার শিহাববে দারুন নাকানিচোবানি খাওয়ালো বেশ কদিন। জেল খাটালো। এবং শেষে দু’পরিবারের মধ্যে যখন একটা মিমাংসা হলো সেখানে সস্তিকা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল বিয়ের কথা, ভালবাসার কথা।
গুল্লু দা শিহাবে গুরুতান্ত্রিক নানান উপদেশ আর সান্তনা দিয়ে ঠান্ডা যদিও করেছিলেন, সাথে সেই পুরতন কথাটা মনে করিয়ে একটু ধমকও দিলেন, বললেন,‘ না বোঝা প্রেমের অবস্থা দেখলে তো।’
শিহাব মাথা নিচু করেছিল।
তারপরই সেই কঠিন সিদ্ধান্ত রোমেলের। বারবার মনে হচ্ছিল্ আসলেই কি তার আর মিথিলার ভালবাসার গভীরতা অপরিমেয়, নিখাদ।
না , যত কষ্টই হোক,তাকে বুঝতেই হবে। সে বোঝার জন্যই মিথিলার সাথে অমন ব্যবহার সেই সকালে যার আগের বিকেলে মিথিলা বলেছিল তার বাসায় বিয়ের জন্য প্রচন্ড চাপ দিচ্ছে।
সেই রাতেই মনে মনে ভেবেছিল রোমেল, ‘এইতো সেই সুযোগ, বিদেশফেরত পাত্র, ভালই হবে, সাথে ভালবাসার প্রকৃত রূপটাও জানা হবে।’
বুঝতে পেরেছিল। তবে, সে বোঝার মাঝে যে মৃত্যু যন্ত্রনা সেটা সে সহ্য করতে পারছিলনা মোটেও। পারেওনি। তাইতো নেশার রাজ্যকে নতুন গুরু মেনেছিল। গুল্লুদার কোন বানী তখন আর তাকে ফেরাতে পারেনি।

পরিশিষ্ট

মিথিলা রোমেলার উপর ভীষণ রাগ আর বাবা মার অতীষ্টকারক চ্যাঁচামেচিতে বিয়েটা করেই ফেলেছিল। বিয়ের ২০ দিনরে মাথায় আমেরিকান সিটিজেন স্বামী বিদেশে পাড়ি জমায়। ততদিন তার পেটে নতুন অতিথি। বাচ্চা পেটে এলে কি হবে সত্যি স্বামীর দিকে এই ২০ দিনে সে একবারও ভাল করে তাকায়নি পর্যন্ত , কেবল আদেশ শুনেছে আর খুলে দিয়েছে রোমেলের উপর এক কোমল প্রকট রাগে দেহের দুয়ার কেবল।
স্বামী বিদেশে নিয়ে যাবে এমনই কথা তার বাবা মাকে জানানো হয়েছে। অথচ বাবার যে বন্ধু এ বিয়ের ঘটক সেই খোঁজ জানাল ওমন বিয়ে বিদেশে যাবার আগে যে চারমাস আজ্জত সাহেব দেশে ছিল সে ক মাসে আরও দুটো করেছে। এবং ২য় বউটিকে ইতিমেধ্য আমেরিকা নিয়েও গেছে। আসলে , লাক ট্রাই ছিল তার কাজ। যেটা কপালে স্যুট করে। হায়রে মানুষ!
একটা কাজ অবশ্য সেই লোকটা ভাল করেছিল। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েদিয়েছিল মাস চারেক বাদে। প্রথম বউটির মত শেষ মানে মিথিলাকেও। অবশ্য দেনমোহর বাদে।
ছেলে আমেরিকার সিটিজেন, চাইলেও আর কি প্রতিশোধ নিতে পারে? অবশ্য মিথিলার জন্য একরকম প্রতিশোধ ছিল তার মা-বাবার চোখের বিবশ কান্না।

বাচ্চাটা নষ্ট করেনি মিথিলা। সেটা সম্ভবত রোমেলের উপর রাগে। অন্তত ছেলের জন্মের আগে কোন খোঁজও আর করেনি সে রোমেলের ।

আশা করেছিল হয়তো কোনদিন পথে দেখা হয়ে যাবে। বড় রাস্তায় ওঠার সময় প্রায়ই রোমেলেদের পাড়াটার দিকে চোখ পড়ত। কিন্তু মিথিলা কি করে জানবে ততদিনে রোমেলকে ভর্তি করা হয়েছে মাদকাশক্ত নিরাময় কেন্দ্রে। এবং সেখান থেকে একসময় মানসিক হাসপাতালে। তার একটাই পাগলামী, সামনে কাউকে দেখলেই সরাক্ষণ বলতে থাকে, ‘প্রেমিকার বাসর রাতেই বোঝা যায় প্রকৃত ভালবাসর রূপ। আর ভালবাসার প্রকৃত রূপ বোঝা মানেই মৃত্যু।’

ঘটনাটা মিথিলা জেনেছিল আরও অনেক পরে। তখন তার ছেলের বয়স দুই বছর। টিভিতে মেন্টাল হাসপাতালের উপর একটা ডুকুমেন্টারি দেখাচ্ছিল; সেখানে ।

মোবাইলের ওপাশে কান্না

মোবাইল টা বেজে ওঠার আর সময় পেলোনা ।
লোকাল বাসের পেছনে বসে ছিলাম , সেখান থেকে উঠেছি মতিঝিলে নামব বলে । কিন্তু নামব বললেই কি আর লোকাল বাসের ভেতর থেকে নামা যায়, সে এক মহাযুদ্ধ মানে অজস্র গুতো আর পায়ের চাপ সহ্য করার পর গেট পর্যন্ত পৌঁছানো যায় এবং নিশ্চিত ততক্ষণে বাস আবার মুভ করা শুরু করে। গতি জড়তার সাথে যুদ্ধ করতে করতে রিস্ককে আলিঙ্গন করে আল্লাহর নাম নিয়ে নেমে পড়তে হয়। ঠিক সেই নামার মুহূর্তে এখন আমি। আর মোবাইলটা বাজতে শুরু করল। বাজুক । কে আর হবে , শুভ্রই হবে। ওর অফিসেই তো যাচ্ছি। অলরেডী অ্যাপয়েন্টেড সময়ের চেয়ে ৩০ মিনিট বেশী সময় পেরিয়েই গেছে। ওই হবে। একটু ফ্রি নিরিবিলিতে …ঐ তো ঐ ফুটপাতের উঠেই ধরব। এর মধ্যে একবার বন্ধ হয়ে আবার নতুন করে বাজতে শুরু করেছে।

পকেট থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়েই অবাক। কি আশ্চর্য ! অকল্পনীয়!
কম করে হলেও সাত মাস পরে ফোন দিয়েছে মেয়েটা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম ’সেমন্তি’ নামটার দিকে। কিন্তু ওর তো ফোন করার কথা না। বলে দিয়েছিল কষ্ট হয়…আমার উত্তর যখন নাই হবে তখন আর কথা না বলাই ভাল।
ভাবনা থাক…তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করলাম। রিসিভ করতে বাকী , আমি হরবর করে বলে গেলাম, কি এত রাগ? একবারও ফোন ধরলে না , করলেও না…আরে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা কি দোষ করেছিল…

কথাগুলো বলে যেই একটু নিশ্বাস নিতে থামলাম ঠিক তখনই খেয়াল হলো ..শুনলাম ফোঁপানীর শব্দ , ভাঙা কণ্ঠে ও কিছূ বলতে চাইছে..ওমন আশ্চর্য এবং ভীত আমি খুব কমই হয়েছি। ঠিক বুঝবেন না কেউ যদি ফোনে কখনও ঠিক ওভাবে কারও কান্নার আওয়াজ না শুনে থাকেন।
আমি হ্যালো হ্যালো বললাম কয়েকবার , তাতে কান্নার আওয়াজ যেন বাড়ল আরেকটু।
কাঁদছ কেনো এভাবে , এত ভয়কর সুরে? কি হয়েছে বল , বল সেমন্তি।
ও বলতে পারলনা। পাশ থেকে অন্যএকজন ধরল। চিনলাম। ওর কাজিন সীমান্ত । খুব বেশী ভদ্রতা দেখালো না। ওর কণ্ঠটাও জড়ানো। ঠিক তখন মনে উঁকি দিল — কেউ কি মারা গেলো, বাবা বা মা ওর?
সীমান্ত বলল , ভাইয়া কেমন আছেন? খুব খারাপ একটা খবর আছে, সায়ান খুন হয়েছে।
মানে? কি বলছ? কিভাবে?
ভাইয়া ওর ঘরে লাশ পাওয়া গেছে , গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো অবস্থায় ।
বলতে বলতে সীমান্ত কেঁদে ফেলল।
ভাইয়া , আত্মহত্যা হতেই পারেনা। কোন কারনই নেই। গতকাল রাত ২টা পর্যন্ত আমার সাথেই ছিল। কত আলাপ। আজ বিকালে ওর ফাইট ছিল লন্ডনের। আমি শিউর- ঐ গ্রুপটাই ওকে মেরেছে। ওরা বলেছিল দেশ ছাড়তে দেবে না।
কারা সীমান্ত ?
যাদের সাথে একদা নেশায় জড়িয়েছিল সেই সব পুরাতন বন্ধূরা। আমি জানি, আরও অনেক জানি।…
আমি কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। সায়ান , সেমন্তির ছোট ভাই। কত আর বয়স , ২০/২২। কি করব বুঝতে পারছি না। বলে উঠলাম , সীমান্ত , তোমার আপুকে দাও।
ভাইয়া , আপু সেই সকালে লাশ দেখার পর থেকে কান্না শুরু করেছে আর থামছেই না। শুধু একবার মোবাইলটা দিয়ে আপনাকে জানাতে বলল। ভাইয়া আপনি কি আসতে পারবেন?
ওকে দাও ফোনটা।
আবর কানে আসল সেই ফোঁপানী..আমি সহ্য করতে পারছিনা। কি ভয়কর কান্না। মেয়েটা সহ্য করছে কিভাবে? না যেতেই হবে।
সেমন্তি যা হবার তা তো হবেই, কেঁদে কি হবে। কান্না থামাও একটু। আমি আসছি..রাখ।
শুধু শুনলাম- বলল, ফোঁপানো কণ্ঠ…আমার কি হবে , কি হবে আমার , সায়ান তুই …তুমি আস..

ফোন রেখে ভাবলাম , শুভ্রর কাছে যাবনা। ফোন দিলাম তাই। ওই বলে উঠল আগে..তুই এত দেরী করছিস কেন? আর আসার দরকার নেই। কাল চেক ভাংগাস। আমি একটু সেমন্তীদের বাসায় যাচ্ছি। ওহ তোকে বলেনি, তুই যাবিনা। নাকি এখনও সেই রাগপর্ব চলছে?

হু মাত্র জানলাম, যাচ্ছি , তুই কই? বেরিয়ে গেছিস…
হু বেরিয়েছি.. তোর ভাবি আছে ইষ্টার্ণ প্লাজায় , গিফট কিনছে, ওকে নিয়ে যাবতো। তুই তাইলে অনুষ্ঠানেই চলে যা, চেকটা মনে করে দিস আমাকে, কাল টাকা তুলে আমি পাঠিয়ে দেবোনে। বাই দা ওয়ে সেমন্তীর বড় বোনের বিয়ের জন্য কি গিফট কিনলি রে?

মানে?

মুহুর্তে মন কিছু বুঝে ফেলল। শুধু শুভ্রকে বললাম , যা আসতেছি…
বলেই রেখে দিলাম মোবাইল।

মনে মনে ভাবলাম, যাব , না ওমন ভয়কর কান্নাটা প্রাকটিস করব একবার।

একুশে বইমেলা ২০০৯ এ প্রকাশিত আমার গল্প সংকলন সংক্ষেপ

বইয়ের নামঃ তথাপি

লেখকঃ মামুন ম. আজিজ

ধরনঃ গল্প সংকলন
প্রকাশকঃ আরেফিন দীপন
জাগৃতি প্রকাশনী, আজিজ মার্কেট
মুল্যঃ ১৪০ টাকা
প্রকাশঃ একুশে বইমেলা ২০০৯

বইটিতে সর্বমোট ১৩ টি গল্পের স্থান হয়েছে। গল্পগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের …খুব সংক্ষেপে গল্পগুলোর সার নিম্নরূপ–

পুনরাবৃত্তি

সেই একই ভুল, যে  ভুলের মাশুল হিসাবে তার জন্ম। পুনরাবৃত্তির আশংকা তাই  আলোড়িত করে পুলক নামের যুবকটিকে। কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে…যদি আরও আগে ভুলটা জানতে পারত, যদি আরও আগে আসত এই আলোড়ন…কিন্তু এমনই হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাধানের সময় থাকেনা আর।

সিজোফ্রেনিক

সিজোফ্রেনিক-খুব ভয়াবহ এক মানসিক রোগ। অতি সন্তর্পনে এ রোগ ঘটনা আর অঘটনার লেজ আঁকড়ে চলে আসে মানুষের মনে , উল্টে পাল্টে দেয় সুস্থির জীবন। নীল নামের একটি ছেলের হঠাৎ সিজোফ্রেনিক ডিসঅরডারে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ঘটনা নিয়েই এই গল্পটি রচিত।

তাঁর অভিমান এবং তাঁর মৃত্যু

স্বাধীন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কোন একজনের জীবন সায়াহ্ণের টুকরো ঘটনার বিষাদ কল্পনা করেই এই গল্প যেখানে দেখানো হয়েছে হালকা কথায় একজন মুক্তিযোদ্ধার ক্ষোভ ।

বিবশ চোখের জল

এই গল্পটির ঘটনা আমাদের গ্রাম বাংলাদেশের প্রেেিত খুব বিপ্রতীপ কিছুনা। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছেলে কিভাবে পালিত ও নিগৃহিত হয় তারই পিতার খুনীদের হাতে স্বাধীনতার বহু বছর পরেও এবং অবশেষে তাকে পঙ্গু হয়ে চোখের জলে কাটাতে হয় কষ্টকাল আর পেটের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রিয়তমা স্ত্রীর দেহ বিকানো টাকায় সেসবই উঠে এসছে একটু বড় আকারের এই গল্পে।

বিশেষ ক্ষমতা

কাউকে দেখেই তার সব বুঝে ফেলা বা অন্যের মনকে পড়ে ফেলার মত বিশেষ ক্ষমতা হয়তো বাস্তবে সত্যি থাকেনা। কিন্তু এই গল্পের নায়কের জীবনে শুরু হয় তেমনই ক্ষমতার প্রভাব। যে প্রভাবেই আসে তার প্রেম এবং প্রেমের পতনও সেই প্রভাবেরই উছিলায়, সেই সাথে ঘটনার পরতে পরতে বের হয়ে আসে কিছু সত্য- কিছু বাস্তবতা।

খ্যাতি প্রক্রিয়ার উপাখ্যান

এটি একটু ভিন্নধর্মী গল্প। খ্যাতিমান হবার পেছনে প্রভাবক এর তর্ক নিয়ে গড়ে উঠেছে গল্পের মূলবক্তব্য। আসলে খ্যাতি কেমনে আসে তার কোন সরল উত্তর হতে পারেনা। তবুও কিছু চরিত্রকে ঘিরে খ্যাতি পক্রিয়ার একপেশে বাস্তবতাকেই তুলে ধরা হয়েছে।

শ্রাবণ ধারায়

খুবই সাদামাটা একটুকরো ঘটনার প্রকাশ এই গল্পটি। শ্রাবণী এবং প্রতীক নামে দুই চরিত্রের সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ পরবর্তী প্রেমের শুরুর ঘটনাটুকুই কেবল এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

মইসা ধরা মন

অনেকদিন পূর্বে লেখা এই গল্পটি কিঞ্চিৎ হাইপোথ্যাটিক্যাল । মানব মনের গহীনে আড়ালে অনেকরকম ভাবনার অনু পরমাণু দৌড়ে দৌড়ে বেড়ায়। সেইসব ভাবনাগুলোকে জড়ো করে দাঁড় করানো হয়েছে এই গল্পটি।

এই না হলে মানুষ

বছর তিনেক আগে একটি দৈনিকের একটি প্রতিবেদন পড়ে বেশ নড়ে উঠেছিল প্রাণ। সেই প্রতিবেদনটির ঘটনাকেই কেন্দ্র করে সাতীরার আঞ্চলিক ভাষায় এই গল্পটি লেখার প্রয়াস খোঁজা হয়েছে।

আড়ালেও কত বাস্তবতা

এই গল্পের বিষয়বস্তু একটু নেতিবাচক। পরকীয়া এ গল্পের মূল উপজীব্য। এই মূল উপজীব্যর আশ্রয়ে দেখানো হয়ছে একই মানবের মাঝে ভাল আর মন্দের অদ্ভুত মিশ্র ছাপ।

হাজার দুয়ারীর স্বপ্ন পেরিয়ে

কতরকম স্বপ্নই দেখি চোখ বুজলে আমরা। কিন্তু দেখিনা আশেপাশেই কত স্বপ্নের কবর, দেখিনা নির্ভৃতে কোন কারও কষ্ট অথচ কষ্টমুক্ত থাকার কথাছিল বরং যার। একুশের মাসে একুশের পরশ শোভিত হয়ে গড়ে উঠেছে এই গল্পটি।

তথাপি

খুবই সামাজিক একটি গল্প। চিরপরিচত প্রেম, ঘর থেকে পালিয়ে বিয়ে, কিছু টক ঝাল মিষ্টি ঘটনা নিয়ে এগোচ্ছিল গল্পটি, তথাপি শেষে সেই মৃত্যুর মত অবধারিত বাধ্যবাধকতার অনুপ্রবেশ; তবুও কি জীবনের গতি থেমে থাকে?

ছোট ছোট বৃত্তের পরিধি

সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার ছাপ আছে এ গল্পে। বিশেষ করে আছে
অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের ঘটে যাওয়া ঘটনার কাল্পনিক কথন।