মোবাইলের ওপাশে কান্না

মোবাইল টা বেজে ওঠার আর সময় পেলোনা ।
লোকাল বাসের পেছনে বসে ছিলাম , সেখান থেকে উঠেছি মতিঝিলে নামব বলে । কিন্তু নামব বললেই কি আর লোকাল বাসের ভেতর থেকে নামা যায়, সে এক মহাযুদ্ধ মানে অজস্র গুতো আর পায়ের চাপ সহ্য করার পর গেট পর্যন্ত পৌঁছানো যায় এবং নিশ্চিত ততক্ষণে বাস আবার মুভ করা শুরু করে। গতি জড়তার সাথে যুদ্ধ করতে করতে রিস্ককে আলিঙ্গন করে আল্লাহর নাম নিয়ে নেমে পড়তে হয়। ঠিক সেই নামার মুহূর্তে এখন আমি। আর মোবাইলটা বাজতে শুরু করল। বাজুক । কে আর হবে , শুভ্রই হবে। ওর অফিসেই তো যাচ্ছি। অলরেডী অ্যাপয়েন্টেড সময়ের চেয়ে ৩০ মিনিট বেশী সময় পেরিয়েই গেছে। ওই হবে। একটু ফ্রি নিরিবিলিতে …ঐ তো ঐ ফুটপাতের উঠেই ধরব। এর মধ্যে একবার বন্ধ হয়ে আবার নতুন করে বাজতে শুরু করেছে।

পকেট থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়েই অবাক। কি আশ্চর্য ! অকল্পনীয়!
কম করে হলেও সাত মাস পরে ফোন দিয়েছে মেয়েটা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম ’সেমন্তি’ নামটার দিকে। কিন্তু ওর তো ফোন করার কথা না। বলে দিয়েছিল কষ্ট হয়…আমার উত্তর যখন নাই হবে তখন আর কথা না বলাই ভাল।
ভাবনা থাক…তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করলাম। রিসিভ করতে বাকী , আমি হরবর করে বলে গেলাম, কি এত রাগ? একবারও ফোন ধরলে না , করলেও না…আরে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা কি দোষ করেছিল…

কথাগুলো বলে যেই একটু নিশ্বাস নিতে থামলাম ঠিক তখনই খেয়াল হলো ..শুনলাম ফোঁপানীর শব্দ , ভাঙা কণ্ঠে ও কিছূ বলতে চাইছে..ওমন আশ্চর্য এবং ভীত আমি খুব কমই হয়েছি। ঠিক বুঝবেন না কেউ যদি ফোনে কখনও ঠিক ওভাবে কারও কান্নার আওয়াজ না শুনে থাকেন।
আমি হ্যালো হ্যালো বললাম কয়েকবার , তাতে কান্নার আওয়াজ যেন বাড়ল আরেকটু।
কাঁদছ কেনো এভাবে , এত ভয়কর সুরে? কি হয়েছে বল , বল সেমন্তি।
ও বলতে পারলনা। পাশ থেকে অন্যএকজন ধরল। চিনলাম। ওর কাজিন সীমান্ত । খুব বেশী ভদ্রতা দেখালো না। ওর কণ্ঠটাও জড়ানো। ঠিক তখন মনে উঁকি দিল — কেউ কি মারা গেলো, বাবা বা মা ওর?
সীমান্ত বলল , ভাইয়া কেমন আছেন? খুব খারাপ একটা খবর আছে, সায়ান খুন হয়েছে।
মানে? কি বলছ? কিভাবে?
ভাইয়া ওর ঘরে লাশ পাওয়া গেছে , গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো অবস্থায় ।
বলতে বলতে সীমান্ত কেঁদে ফেলল।
ভাইয়া , আত্মহত্যা হতেই পারেনা। কোন কারনই নেই। গতকাল রাত ২টা পর্যন্ত আমার সাথেই ছিল। কত আলাপ। আজ বিকালে ওর ফাইট ছিল লন্ডনের। আমি শিউর- ঐ গ্রুপটাই ওকে মেরেছে। ওরা বলেছিল দেশ ছাড়তে দেবে না।
কারা সীমান্ত ?
যাদের সাথে একদা নেশায় জড়িয়েছিল সেই সব পুরাতন বন্ধূরা। আমি জানি, আরও অনেক জানি।…
আমি কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। সায়ান , সেমন্তির ছোট ভাই। কত আর বয়স , ২০/২২। কি করব বুঝতে পারছি না। বলে উঠলাম , সীমান্ত , তোমার আপুকে দাও।
ভাইয়া , আপু সেই সকালে লাশ দেখার পর থেকে কান্না শুরু করেছে আর থামছেই না। শুধু একবার মোবাইলটা দিয়ে আপনাকে জানাতে বলল। ভাইয়া আপনি কি আসতে পারবেন?
ওকে দাও ফোনটা।
আবর কানে আসল সেই ফোঁপানী..আমি সহ্য করতে পারছিনা। কি ভয়কর কান্না। মেয়েটা সহ্য করছে কিভাবে? না যেতেই হবে।
সেমন্তি যা হবার তা তো হবেই, কেঁদে কি হবে। কান্না থামাও একটু। আমি আসছি..রাখ।
শুধু শুনলাম- বলল, ফোঁপানো কণ্ঠ…আমার কি হবে , কি হবে আমার , সায়ান তুই …তুমি আস..

ফোন রেখে ভাবলাম , শুভ্রর কাছে যাবনা। ফোন দিলাম তাই। ওই বলে উঠল আগে..তুই এত দেরী করছিস কেন? আর আসার দরকার নেই। কাল চেক ভাংগাস। আমি একটু সেমন্তীদের বাসায় যাচ্ছি। ওহ তোকে বলেনি, তুই যাবিনা। নাকি এখনও সেই রাগপর্ব চলছে?

হু মাত্র জানলাম, যাচ্ছি , তুই কই? বেরিয়ে গেছিস…
হু বেরিয়েছি.. তোর ভাবি আছে ইষ্টার্ণ প্লাজায় , গিফট কিনছে, ওকে নিয়ে যাবতো। তুই তাইলে অনুষ্ঠানেই চলে যা, চেকটা মনে করে দিস আমাকে, কাল টাকা তুলে আমি পাঠিয়ে দেবোনে। বাই দা ওয়ে সেমন্তীর বড় বোনের বিয়ের জন্য কি গিফট কিনলি রে?

মানে?

মুহুর্তে মন কিছু বুঝে ফেলল। শুধু শুভ্রকে বললাম , যা আসতেছি…
বলেই রেখে দিলাম মোবাইল।

মনে মনে ভাবলাম, যাব , না ওমন ভয়কর কান্নাটা প্রাকটিস করব একবার।

Comments (1)

adminFebruary 1st, 2009 at 11:36 pm

!

Leave a comment

Your comment